সংস্কৃতি কী ও কেন?

হিতাংশু ভূষণ করঃ বাংলাদেশে জনজীবনের উন্নতির জন্য এবং জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য উন্নত চরিত্রের রাজনীতি ও মহান নেতৃত্ব দরকার। কীভাবে তা সম্ভব হবে সেটাই মূল প্রশ্ন। রাজনীতির উন্নতি ছাড়া জাতীয় সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব হয় না। অদৃশ্য শক্তি অঘোষিত নিঃরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম ১৯৮০-র দশক থেকে বাংলাদেশে চালিয়ে আসছে, তাতে জনমন এখন রাজনীতিবিমুখ_ এমনকি রাজনীতির প্রতি বিরূপ। জাতীয় রাজনীতির নবউজ্জীবনের মাধ্যমে কীভাবে প্রগতির পথ ধরে সর্বাঙ্গীন উন্নতির দিকে এগোনো যাবে, সেটাই হওয়া উচিত জাতীয় জীবনে এখন আমাদের সংস্কৃতিচিন্তার মূল বিষয়।আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, সংস্কৃতি সম্পূর্ণই মানবীয় ব্যাপার। পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে আপন চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি ব্যবহার করে প্রাণীবিশেষ মানুষের উত্তীর্ণ হয়েছে এবং মানুষ সংস্কৃতিচেতনার বলে পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উন্নতি করে চলছে। সংস্কৃতিচেতনা হলো চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তির সমন্বিত কার্যকর বিকাশশীল রূপ। গর্ডন চাইল্ডের বিখ্যাত বই গধহ গধশবং ঐরসংবষভ. ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজেদের গড়ে তোলা, সৃষ্টি করা_ জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বিবর্তনের ধারায় বিকশিত করা হলো সংস্কৃতি। একমাত্র মানুষই পারে নিজের ও নিজের পরিবেশের সংস্কার করতে। সংস্কৃতির মধ্যে প্রগতির তাগিদ অন্তর্নিহিত। কেবল মানুষেরই সংস্কৃতি আছে, অন্য কোনো প্রাণীর নেই। মানুষ সেই জৈবিক সামর্থ্যের অধিকারী, যার বলে সে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রয়াসে নিজের ও নিজেদের সংস্কৃতির পরিচয় দিতে পারে। ঞযব উবপবহঃ ড়ভ গধহ গ্রন্থে ডারউইন উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কী করে মানুষ নিজের অজান্তেই নিজেকে সৃষ্টি করে চলছে। মানুষের বিবর্তনে মানুষের ব্যক্তিগত ও যৌথ সংস্কৃতিচেতনাই কর্তা।

জাতীয় জীবনে সংস্কৃতিচেতনা দুর্বল হলে, বিকৃত হলে জাতির উন্নতি ব্যাহত হয়। বিবর্তনের যে পর্যায়ে এসে মানুষ তার সংস্কৃতির পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছে, তার পূর্ব পর্যন্ত অন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য স্পষ্ট হয়নি_ অর্থাৎ মানুষের মধ্যে মানবীয় বৈশিষ্ট্য বা মনুষ্যত্ব তখনো দেখা দেয়নি। তখন তার ছিল প্রাণিত্ব, জন্তুত্ব, জানোয়ারত্ব, পশুত্ব। আজকের দিনেও সভ্যসমাজে সংস্কৃতিমান সমাজে যারা সভ্যতাবিরোধী সংস্কৃতিবিরোধী আচরণ করে তারা বর্বর, অমানুষ, পশু জন্তু, জানোয়ার ইত্যাদি বলে অভিহিত হয়।

জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে ব্যক্তির ও জাতির পরিবেশের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কর্মফল রূপে ঘটছে উত্থান-পতন ও উন্নতি-অবনতি। ব্যক্তি ও জাতি নিজের পরিবেশ পরিবর্তন করছে, সেই সঙ্গে নিজেও পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত উভয় অবস্থায়ই মানুষের মধ্যে থাকে উন্নতির ও পরিশ্রুতির তাগিদ। এ তাগিদই মানুষকে_ মানবসমষ্টিকে সংস্কৃতিমান রাখে।

সংস্কৃতি হলো কোনো ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর কিংবা জাতির নিজের কিংবা নিজেদের জীবনের ও পরিবেশের উৎকর্ষ সাধনের ও উন্নতি বিধানের এবং ইচ্ছানুযায়ী ইতিহাসের গতি নির্ধারণের চিন্তা ও চেষ্টা। জীবন ও পরিবেশ অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে যুক্ত। জীবন পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল ও ক্রিয়াশীল, পরিবেশও জীবনের ওপর ক্রিয়াশীল। এ দুয়ের একটির উন্নতি অন্যটির উন্নতির ওপর নির্ভরশীল। উন্নতি আপনিতেই ঘটে না, সাধন করতে হয়। উন্নতির প্রক্রিয়ায় মানুষই কর্তা। সংস্কৃতি হলো চিন্তার ও কাজের তথা জীবনযাত্রার সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল, পরিশ্রুতিমান, উৎকর্ষমান, সৌন্দর্যমান, পূর্ণতাপ্রয়াসী প্রদ্ধতি। জীবনযাত্রার মধ্যদিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকেও সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উন্নত করার যে প্রবণতা, চিন্তা ও চেষ্টা, তারই মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, আদর্শগত সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, দলীয় সংস্কৃতি, জাতীয় সংস্কৃতি, প্রাচীন যুগের সংস্কৃতি, মধ্যযুগের সংস্কৃতি ইত্যাদি অনুধাবন করলে অনেক কিছু বোঝা যায়। জাতিগঠন ও রাষ্ট্রগঠনের মধ্যদিয়ে, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা ও ইতিহাস সৃষ্টির মধ্যদিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। সংস্কৃতি ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক_ সব পর্যায়েরই ব্যাপার। প্রভাবের পারস্পরিকতা সত্ত্বেও প্রত্যেক জাতির সংস্কৃতি স্বতন্ত্র। প্রত্যেক জাতির প্রত্যেক ঐতিহাসিক যুগের সংস্কৃতিতেও আছে স্বাতন্ত্র্য। জীবনযাত্রার মধ্যদিয়ে মানুষের সুন্দর হওয়ার ও সুন্দর করার এবং উন্নত হওয়ার ও উন্নত করার প্রবণতা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক আছে রুচি, পছন্দ, দৃষ্টি, শ্রুতি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি, সমাজবোধ, বিবেক-বুদ্ধি, আহার্য, ব্যবহার্য, পরিপার্শ্ব, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিচারক্ষমতা, গ্রহণ-বর্জন ও প্রয়াস-প্রচেষ্টার। সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, অন্তরিন্দ্রিয় ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে। কোনো ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর কিংবা জাতির উৎপাদনসামর্থ্য, সৃষ্টিসামর্থ্য, মূল্যবোধ, ন্যায়নিষ্ঠা, কল্যাণচেতনা, সত্যপ্রিয়তা, সৌন্দর্যবুদ্ধি ও উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্যদিয়ে সেই ব্যক্তির কিংবা জনগোষ্ঠীর কিংবা জাতির সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।

দেশকাল ও পাত্রের পার্থক্য অনুযায়ী এই বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে ধারণা পরিবর্তিত হয়। আর এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে।

যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে পশ্চাৎবর্তী ও দরিদ্র, তাদেরও সংস্কৃতি আছে। অগ্রসর সংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণের মধ্যদিয়ে তারা সংস্কৃতিমান থাকে। আত্মবিকাশের পথে তাদের অন্তরায় অনেক। ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা শক্তি অর্জন করে। যারা সৃষ্টিশীল নয়, তারা ঐতিহ্য ও পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত সংস্কৃতি নিয়ে চলে। যারা বর্বর তারাও সংস্কৃতিমান হতে পারে। সংস্কৃতি প্রগতিশীল, কিংবা রক্ষণশীল, কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে থাকে।
মানুষের সব চিন্তা ও কর্ম এবং উৎপাদন ও সৃষ্টিই সংস্কৃতির বাহন। নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, কমিক ইত্যাদি সংস্কৃতির আংশিক বাহন মাত্র, সংস্কৃতি নয়। সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক উৎসব, সাংস্কৃতিক দল ইত্যাদির মধ্যদিয়ে সংস্কৃতির যে রূপ প্রকাশ পায় তা আংশিক রূপ মাত্র। নাচ-গান ও শিল্প-সাহিত্যের মধ্যদিয়ে যেমন, তেমনি দর্শন-বিজ্ঞান- ইতিহাস, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তা ও চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক সব কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে প্রকাশ পায় ব্যাক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতি।

আত্মশক্তিকে সংগঠিত করে, বিদেশের ও অতীতের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটন ও ইতিহাসের গতি নির্ধারণের চিন্তা ও চেষ্টা আর ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, কর্তব্য-অকর্তব্য ও সুন্দর-কুৎসিত বিচার করে ন্যায়, কল্যাণ, কর্তব্য ও সুন্দরকে অবলম্বন করে সৃষ্টিশীল জীবনযাপনের চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্যেই ব্যক্তির ও সমষ্টির উন্নত সংস্কৃতির পরিচয়। কোনো জাতির সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ঘটে সেই জাতির কৃতী ও কীর্তির মধ্যদিয়ে। জাতীয় চরিত্র জাতীয় সংস্কৃতির জাতক। জাতির আত্মা বলে যদি কিছু আমরা কল্পনা করি তাহলে তার অবস্থান হবে জাতীয় সংস্কৃতির মর্মে। জাতীয় সংস্কৃতিতেই বিরাজ করে জাতির জাতিত্ব। সমাজের সংস্কৃতি হলো পরস্পরের বন্ধনসূত্র। জাতীয় সংস্কৃতি জাতীয় উত্থান ও জাতীয় উন্নতির অবলম্বন হয়ে থাকে।

সংস্কৃতি যতটা জানার, ততটাই করারও ব্যাপার। সংস্কৃতির জন্য জানার মধ্যে করার আগ্রহ, আর করার মধ্যে সংস্কৃতিচেতনার সক্রিয়তা অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। জনজীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনসাধারণের চিন্তাধারা এবং রুচি, পছন্দ, প্রবণতা ও আকাঙ্ক্ষা পরিবর্তনের আন্দোলনই সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সাধারণত রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানগত শক্তি অর্জনের, জনমত গঠনের এবং জনগণের মানসিকতা পরিবর্তনের উদ্দেশে পরিচালিত হয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

কোনো ব্যক্তির, গোষ্ঠীর, কিংবা জাতির সংস্কৃতিচেতনা যখন স্বাভাবিক বিকাশের পথ পায় না, তখন দেখা দেয় অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি সংস্কৃতির বিকারপ্রাপ্ত রূপ। অপসংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে অনুচিত, অন্যায়, নিষ্ঠুর, অশঈল, অসুন্দর কার্যকলাপের মধ্যদিয়ে। ঢাকায় ১৯৭২ সালের শুরু থেকেই অপসংস্কৃতি কথাটি সভা-সমাবেশে এবং রেডিও-টেলিভিশনে পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত হতে থাকে। তখন সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রে ঘন ঘন শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ্য করি। ১৯৮০-র দশকে এসে ঢাকায় রাজনীতিবিদদের ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও জাতীয় সংস্কৃতিকে উন্নত করার আগ্রহ লোপ পায়। কলকাতায় এ শব্দটি উদ্ভাবিত হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগেই। সেখানে থেকেই এটি ঢাকায় এসেছিল।

বাংলাদেশকে উঠতে হলে জাতীয় সংস্কৃতির গুরুত্ব তাকে বুঝতে হবে এবং সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তা ও কর্মের নুতন ধারা আরম্ভ করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ এখন সাংস্কৃতিক পতনশীলতা থেকে বংশগত পতনশীলতায় নিপতিত। এ অবস্থায় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন অপরিহার্য। নবউত্থানের জন্য দরকার রেনেসাঁস ও গণজাগরণ। রেনেসাঁস, স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও প্রগতি নিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-তরুণদের মধ্যে যদি জানার ও করার আগ্রহ দেখা দেয়, তাহলে বাংলাদেশ ভেতর থেকে জেগে উঠবে। নতুন বৌদ্ধিক জাগরণ ও গণজাগরণ দেখা দিলেই বাংলাদেশ সার্বিক উন্নতির পথ পাবে।

১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে সংস্কৃতি কথা প্রবন্ধে মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬) লিখেছিলেন ‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা-সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিত। সাধারণ লোকরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা। বিকাশকে বড় করে দেখে না বলে ধর্ম সাধারণ ইন্দ্রিয়সাধনার পরিপন্থী। অথচ ইন্দ্রিয়ের পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে জীবন সাধনারই অপর নাম কালচার। মন ও আত্মার সঙ্গে যোগযুক্ত করে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বকের নবজন্মদানই কালচারের উদ্দেশ্য। মোতাহের হোসেন চৌধুরী এবং তখনকার অগ্রসর চিন্তার অন্য লেখকরা চাইতেন সাধারণ মানুষের ধর্মবোধে আঘাত না দিয়ে তাদের বৈষয়িক ও মানসিক জীবনকে উন্নত করার উপায় বের করতে। অধিকন্তু তারা চাইতেন, চেষ্টা করতেন, যারা সুধী, যারা জ্ঞানী ও গুণী, যারা মনীষাসম্পন্ন, তারা যাতে ধর্ম অতিক্রম করে সংস্কৃতি অবলম্বন করে চলেন এবং সর্বজনীন কল্যাণে কাজ করেন।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সাল থেকে সে ধারার সংস্কৃতিচিন্তা দেখাও দেয়নি। গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে ভোটাভুটিতে, নেতৃত্বের বংশাণুক্রমিক উত্তরাধিকারে, গণতন্ত্রবিমুখ রাজনৈতিক দলে, পরিবার তন্ত্রে দূতাবাসমুখী রাজনীতিতে, দুর্নীতিতে ও সহিংসতায়। এরই মধ্যে তাৎপর্য বিচার করে দেখা দরকার। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র নিয়ে অনেক কর্মকা- চালানো গণতন্ত্রের সমস্যা এবং গণতন্ত্রের পথে বাধা-বিপত্তি ইত্যাদি বাংলাদেশের বাস্তবতায় বোঝার চেষ্টা করা হয়নি। সমাজতন্ত্রের বেলায়ও ঘটেছে একই ব্যাপার। ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে তুমুল বিরোধের পরিণতিতে দুটোকেই সংবিধানে ও শিক্ষানীতিতে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মানববাদ পরিহার করে নারীবাদ নিয়ে তুমুল আন্দোলন চালানো হয়েছে। ফল কী হয়েছে? নারী-নির্যাতন, নারীর আত্মহত্যা, নারী হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, ফতোয়াবাজি তো বাড়ছে! নারীত্ব আর পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে সমাধান খুঁজতে হবে।

বঙ্কিম থেকে মোতাহের হোসেন চৌধুরী পর্যন্ত সংস্কৃতিচিন্তার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে অগ্রগতি, আমাদের জাতি এখন চলছে ঠিক তার বিপরীত ধারায়। ইতিহাসের চাকা, অন্তত সংস্কৃতিবিচারে পেছনে দিকে ঘুরছে। স্বাধীন বাংলাদেশে পেঁৗছে চার দশকের মধ্যে আমরা কি আমাদের স্বকীয়তা, সৃষ্টিসামর্থ্য ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা বিসর্জন দিইনি?

গত দুই দশক ধরে আমরা চলছি বিশ্বায়নের প্রচ- অভিঘাত সহ্য করতে করতে। বিশ্বায়নের সংস্কৃতিকে সাধারণত আকাশ সংস্কৃতি বলে নিন্দাবাদ করা হয়। কিন্তু তাতে সুফল কিছুই হয় না। আকাশ সংস্কৃতি কী, এখনো কেউ তা ব্যাখ্যা করেননি। পতনশীল অবস্থা থেকে উত্থানের জন্য বিশ্বায়নের অভিঘাত ব্যাপারটিকে আমাদের বুঝতে হবে।

ইতিহাসে দেখা যায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সম্পদের বিকাশের সঙ্গে সমান তালে মানুষের মনোবৃত্তি উন্নত হয় না। বড় রকমের আবিষ্কার-উদ্ভাবনের পর নতুন প্রযুক্তি যখন বৃহৎ আয়তনে জনসাধারণের জীবনযাত্রার অঙ্গীভূত হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বিধি-বিধান, রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন ও আর্থ-সামাজিক সব ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য ও অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ পরিবর্তনের বেলায় ন্যায়-অন্যায়, প্রগতি এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রশ্ন অবশ্যবিবেচ্য। পরিবর্তন এমন হওয়া উচিত যাতে ন্যায় সুরক্ষিত হয় ও বৃদ্ধি পায়।

এ ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই বিশ্বায়নের সংস্কৃতির পরিচয়। বিশ্বব্যাপী কায়েমি স্বার্থবাদীরা সাধারণ মানুষকে সুস্থ স্বাভাবিক সংস্কৃতির ধারা থেকে সরিয়ে নিয়ে তাদের পরিকল্পিত অনুষ্ঠানাদিতে- নাচ, গান, বিনোদনে মাতিয়ে রাখে এবং অভিসন্ধি সফল করে।

বাংলাদেশে জনজীবনের উন্নতির জন্য এবং জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য উন্নত চরিত্রের রাজনীতি ও মহান নেতৃত্ব দরকার। কীভাবে তা সম্ভব হবে সেটাই মূল প্রশ্ন। রাজনীতির উন্নতি ছাড়া জাতীয় সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব হয় না। অদৃশ্য শক্তি অঘোষিত নিঃরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম ১৯৮০-র দশক থেকে বাংলাদেশে চালিয়ে আসছে, তাতে জনমন এখন রাজনীতিবিমুখ_ এমনকি রাজনীতির প্রতি বিরূপ। জাতীয় রাজনীতির নবউজ্জীবনের মাধ্যমে কীভাবে প্রগতির পথ ধরে সর্বাঙ্গীন উন্নতির দিকে এগোনো যাবে, সেটাই হওয়া উচিত জাতীয় জীবনে এখন আমাদের সংস্কৃতিচিন্তার মূল বিষয়।

নতুন প্রযুক্তিকে সর্বজনীন কল্যাণে ব্যবহার করার ও বিকাশশীল রাখার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। নয়াগণতন্ত্রের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী গড়ে তুলতে হবে জনগণের নতুন জাতিরাষ্ট্র, সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তিতে বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করে গড়ে তুলতে হবে জনগণের আন্তর্জাতিক বিশ্বরাষ্ট্র। (গণতন্ত্র ও নয়াগণতন্ত্র বইতে এ বিষয়ে আমি আমার মত ব্যক্তি করেছি)। সেই লক্ষ্যে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে প্রথমে দরকার সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

সোয়া দুই হাজার বছর পার হয়েছে, প্লেটোর স্বপ্ন কি সফল হয়েছে? প্লেটোর স্বপ্ন কি ব্যর্থ হয়ে গেছে? পরিকল্পিত আদর্শ রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম প্রবর্তক হজরত মুহম্মদ চেষ্টা করেছিলেন, এবং মনীষী কার্ল মার্কস চেষ্টা করেছিলেন। তাদের চেষ্টা কি সফল হয়েছে? তাদের চেষ্টা কি ব্যর্থ হয়েছে? প্রগতিশীল বিজ্ঞানসম্মত আদর্শ নিয়েই চলতে হবে। কৌতূহল, কল্পনা এবং আদর্শ উদ্ভাবনের কিংবা আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা না থাকলে মানুষের জীবন স্বাভাবিক থাকে না। সংস্কৃতির জয় হোক।

শেয়ার করুন