নিউজিল্যান্ডে সাব্বিরের সেঞ্চুরির পরেও বাংলাদেশের হার

প্রথম দুই ম্যাচে আগে ব্যাট করে পেস-স্যুয়িংয়ে লুটোপুটি খেয়েছিল টপ অর্ডার। এবার পরে ব্যাট করে হলো আরও করুণ দশা। সিরিজ হার হয়েছে আগের ম্যাচেই। মিশন ছিল হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর। তবে তারচেয়ে বেশি ছিল নিউজিল্যান্ডে মাঠে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস জড়ো করা। হয়নি না কিছুই। এবার আগের দুই ম্যাচে না খেলা টিম সাউদি একাই সর্বনাশ করে ছেড়েছেন বাংলাদেশের। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার আরেকটি হতাশার দিনে প্রাপ্তি কেবল সাব্বির রহমানের সেঞ্চুরি।

বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ডানেডিনে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের ৩৩০ রানের জবাবে বাংলাদেশ থেমেছে ২৪২ রানে। ৮৯ রানের লড়াই বিহীন আরেকটি হারে সিরিজে হয়েছে হোয়াইটওয়াশ।

জবাব দিতে নেমে শুরুতেই টিম সাউদির পেস তোপে পড়ে বাংলাদেশ। সূচনালগ্নে তার বলে উইকেটের পেছনে টম লাথামকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ড্যাশিং ওপেনার তামিম। এই সিরিজে সুপার ফ্লপ তিনি। এর রেশ না কাটতেই এই ডানহাতি পেসারের বলে সরাসরি বোল্ড হয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার। ফিরতি ওভারে রানের খোঁজে থাকা লিটন দাসকে এলবিডব্লিউ করে তিনি ফিরিয়ে দিলে চাপে পড়ে টাইগাররা।

এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন মুশফিকুর রহিম। ভালোই এগোচ্ছিলেন তারা। তবে আচমকা থেমে যান মুশফিক। ট্রেন্ট বোল্টের শিকার হয়ে ফেরেন অফফর্মে থাকা মিস্টার ডিপেন্ডেবল। পরে টিকতে পারেননি মাহমুদউল্লাহও। কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমের বলে কলিন মানরোকে লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে তিনি ফিরলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাংলাদেশ। এবার কোনো ম্যাচেই তার সাইলেন্ট কিলারের ভূমিকাটা দেখা গেল না।

৩৩১ রানের পাহাড়সম টার্গেট। সেই লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৬১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। সেই পরিস্থিতিতে ক্রিজে আসেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ভীষণ চাপের মুখে তাকে নিয়ে দলের হাল ধরেন সাব্বির রহমান। ধীরে ধীরে এগিয়ে যান তারা। এতে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে টাইগাররা। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দারুণ মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। পথিমধ্যে ফিফটি তুলে নেন সাব্বির। ফিফটির পথে এগিয়ে যান সাইফউদ্দিন। তাতে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেন তারা।

কিন্তু বিধিবাম! থেমে যেতে হয় সাইফউদ্দিনকে। ঠিকমতো ব্যাটে-বলে না হওয়ায় বোল্টের বলে গ্র্যান্ডহোমকে ক্যাচ দিয়ে আসেন তিনি। ফেরার আগে ৬৩ বলে ৪ চারে ৪৪ রানের সংগ্রামী ইনিংস খেলেন সাইফ। এই অলরাউন্ডার ফিরলে ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন এনে মিরাজকে বসিয়ে নামেন মাশরাফি। তবে সাব্বিরকে যোগ্য সহযোদ্ধার সমর্থন দিতে পারেননি তিনি। সাউদির চতুর্থ শিকার হয়ে বোল্টের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন তিনি। এতে জয়ের প্রহর গুনতে থাকে নিউজিল্যান্ড।

একে একে যাওয়া-আসার মিছিলে যোগ দেন টপঅর্ডার-মিডলঅর্ডাররা। তবে থেকে যান সাব্বির। বুক চিতিয়ে লড়েন তিনি। ক্রিজে এসে তাকে সঙ্গ দেন মিরাজ। ফিফটি তুলে সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যান সাব্বির। শেষ পর্যন্ত ১০৫ বলে ১২ চার ও ২ ছক্কায় তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করেন তিনি। এটিই তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরি। এই হার্ডহিটারের ঝুলিতে রয়েছে ৫টি হাফসেঞ্চুরির ইনিংস। তার তিন অংক ছোঁয়ার পরই খেই হারান মিরাজ। সাউদির ওপর চড়াও হতে গিয়ে গাপটিলকে ক্যাচ দিয়ে আসেনব তিনি। সাজঘরে ফেরার আগে ৩৪ বলে ৭ চারে ৩৭ রানের মারকুটে ইনিংস খেলেন স্পিন অলরাউন্ডার।

বুধবার ডানেডিনে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এ ম্যাচে নিয়মিত কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের পরিবর্তে খেলতে নামেন কলিন মানরো। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। শুরুতেই তাকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে প্রথমে বোলিং নেয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন মাশরাফি নিজেই।

ওয়ানডাউনে নেমে মার্টিন গাপটিলকে নিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠেন হেনরি নিকোলস। তবে এদিন খুব বেশিদূর যেতে পারেননি ফর্মের মগডালে থাকা গাপটিল। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের বলে তামিমের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি হাঁকানো এই ব্যাটার। ফেরার আগে করেন ৪০ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কায় ২৯ রান।

পরে রস টেইলরকে নিয়ে খেলা ধরেন নিকোলাস। প্রথমে ধীরলয়ে হাঁটলেও ক্রিজে সেট হওয়ার পর কোপ বসাতে শুরু করেন তারা। ছোটান স্ট্রোকের ফুলঝুরি। তাতে উল্কার গতিতে ছোটে নিউজিল্যান্ড। তবে হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে যান নিকোলাস। দুর্দান্ত খেলতে থাকা এই ওপেনারকে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তামিমের তালুবন্দি হওয়ার আগে ৭৪ বলে ৭ চারে ৬৪ রান করেন তিনি।

তবে থেকে যান টেলর। এবার এসে তাকে সঙ্গ দেন টম লাথাম। ফলে রানের চাকা সচল থাকে। পথিমধ্যে ফিফটি তুলে নেন টেলর। এর সঙ্গে ১ রান যোগ হতেই বনে যান নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এর আগে রেকর্ডটি দখলে ছিল সাবেক ব্ল্যাক-ক্যাপস অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের দখলে। সবার ওপরে ওঠে অবশ্য বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি তিনি। দলীয় ২০৬ রানে রুবেল হোসেনের বলে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ তুলে দেন টেলর। মাহমুদউল্লাহর তালুবন্দি হওয়ার আগে ৮২ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৬৯ রান করেন মিডলঅর্ডারে ব্যাটিং স্তম্ভ।

শুরুটা ভালো হলে এবং মাঝপথে রানের চাকা ভালোভাবে গড়লে পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য রান তোলার গতিটা বাড়ানো সহজ হয়। সেটাই বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন লাথাম ও জেমস নিশাম। টেইলের বিদায়ের পর তাণ্ডব চালান তারা। ব্যাটকে তলোয়ার বানিয়ে টাইগার বোলারদের কচুকাটা করে রানের ফোয়ারা ছোটান এই জুটি। এই পরিস্থিতিতে নিশামের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন মোস্তফিজুর রহমান। ফেরার আগে ২৪ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৩৭ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন তিনি। পরক্ষণেই লাথামকে সৌম্য সরকারের ক্যাচে পরিণত করেন কাটার মাস্টার। ড্রেসিং রুমের পথ ধরার আগে ৫১ বলে ২ চারের বিপরীতে ৩ ছক্কায় ৫৯ রানের নান্দনিক ইনিংস খেলেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। ততক্ষণে চ্যালেঞ্জিং স্কোরের ভিত পেয়ে যায় স্বাগতিকরা।

শেষদিকে এর ওপর দাঁড়িয়ে মাশরাফিদের ওপর স্টিম রোলার চালান কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম ও মিচেল স্যান্টনার। রানের নহর বইয়ে দেন তারা। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ওভারে ৬ উইকেটে ৩৩০ রানের পাহাড় গড়ে নিউজিল্যান্ড। মাত্র ১৫ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৩৭ রানের হার না মানা ঝড়ো ইনিংস খেলেন গ্র্যান্ডহোম। আর ৯ বলে ১ চারে ১৫ রানে অপরাজিত থাকেন স্যান্টনার। বাংলাদেশের হয়ে মোস্তাফিজ নেন ২ উইকেট। ১টি করে উইকেট নেন মাশরাফি, রুবেল, মিরাজ ও সাইফউদ্দিন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

নিউজিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩৩০/৬ (গাপটিল ২৯, মনরো ৮, নিকোলাস ৬৪ , টেইলর ৬৯, ল্যাথাম ৫৯ , নিশাম ৩৭, গ্র্যান্ডহোম ৩৭, স্যান্টনার ১৬ ; মাশরাফি ১/৫১, মোস্তাফিজ ২/৯২, রুবেল ১/৬৪ , সাইফুদ্দিন ১/৪৮, মিরাজ ১/৪৩, মাহমুদউল্লাহ ০/২৮)

বাংলাদেশ: ৪৭.২ ওভারে ২৪২ (তামিম ০, লিটন ১, সৌম্য ০, মুশফিক ১৭, মাহমুদউল্লাহ ১৬, সাব্বির ১০২* , সাইফুদ্দিন ৪৪, মাশরাফি ২, মিরাজ ৩৭, রুবেল ৩, মোস্তাফিজ ০*; সাউদি ৬/৬৫ , বোল্ট ২/৩৭, গ্র্যান্ডহোম ১/১৮, ফার্গুসেন ০/৫০, স্যান্টনার০/৪৬, নিশাম ০/২৪ )

ফল: নিউজিল্যান্ড ৮৯ রানে জয়ী।

সিরিজ: নিউজিল্যান্ড ৩-০ ব্যবধানে জয়ী।

শেয়ার করুন